× home হোম archive আগের ওয়েব সংখ্যা panorama ডুয়ার্স সম্পর্কে play_circle_filled ভিডিও file_download মুদ্রিত সংখ্যার পিডিএফ library_books আমাদের বইপত্র
people এখন ডুয়ার্স সম্পর্কে article শর্তাবলী security গোপনীয়তা নীতি local_shipping কুরিয়ার পদ্ধতি keyboard_return বাতিল/ফেরত পদ্ধতি dialpad যোগাযোগ
login লগইন
menu
ad01112021081913.jpg

ডুয়ার্সের চা: রোমাঞ্চকথা আজ ইতিহাসের পথে

রূপন সরকার
Dooarser Cha Romancha Kotha Aaj Itihaser Pathe

এমন যদি আস্ত একটা বই যদি লিখতে পারা যেত যার নাম হতো ‘ডুয়ার্সের চা: রোমাঞ্চ কাহিনি থেকে ইতিহাসের পথে’! ডুয়ার্সের চা-বাগিচা শিল্পের অতীত ও বর্তমানকে সামনে রাখলে এমন ইচ্ছের স্বপক্ষে যথেষ্ট যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায়। ডুয়ার্সের চা চাষের সূচনাটা যেমন ছিল রোমাঞ্চকর, এর বর্তমান অবস্থা ততধিক করুণ। শ্রদ্ধেয় সমাজবিজ্ঞানী বিমলেন্দু মজুমদার তাঁর, 'উত্তরবঙ্গের আদিবাসী' গ্রন্থে এক জায়গায় লিখেছিলেন, “এই এলাকাগুলি এক সময়কার জনবিরল মরিশাস, ব্রিটিশ গায়েনা, ত্রিনিদাদ, জামাইকা প্রভৃতি অঞ্চলের সাথে গঠনগত অনেক মিল ছিল। ১৮৬৪-৬৫ সালে দ্বিতীয় ইঙ্গ-ভুটান যুদ্ধের পর এই এলাকা ব্রিটিশ অধিকারে এলে তারা এই জনবিরল এলাকাগুলিকে মরিশাস, ব্রিটিশ গায়েনা বা ত্রিনিদাদের মতো চা-উৎপাদনকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক-অর্থনৈতিক লাভজনক উপনিবেশে পরিণত করার প্রস্তুতি নেয়।”

এই পরিকল্পনার ফলশ্রুতিতেই প্রথমে ব্রিটিশদের হাত ধরে, পরে বাঙালি বাবুদের হাত ধরে যখন একের পর এক চা বাগান তৈরি হতে শুরু করে তখন বাগানগুলি ছিল এক একটি যৌথ পরিবার। বাগান মালিক, ম্যানেজার, করণিক শ্রেণী, শ্রমিক শ্রেণী এই সব মিলিয়ে একটি যৌগিক একক। মালিকের সাথে শ্রমিকের শুধু শ্রম এবং মজুরির সম্পর্ক ছিল না। শ্রমিকের বাসস্থান, পানীয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রেশন সবকিছুর দায়িত্বে ছিলেন মালিকেরা। ইউরোপীয় তথা ভারতীয় মালিকরা বাগানকে শুধু মুনাফা লাভের যন্ত্র হিসেবে দেখতেন না। তাঁরা শ্রমিক কর্মচারীর সমস্ত দায়িত্ব পালন করার পর বাগান রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মুনাফার কিছুটা পুনর্বিনিয়োগ করতেন। এক কথায় বাগানকে তাঁরা নিজের পরিবারের মতো আগলে রাখতেন।

কিছু বাগানের নামকরণ থেকেও সেই তথ্য উঠে আসে। যেমন মধু চা বাগানটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন স্বর্গীয় তারিণী প্রসাদ রায় তাঁর সহকর্মী জয়গোবিন্দ গুহ ও পূর্ণচন্দ রায়ের সঙ্গে মিলিতভাবে ১৯২৫ সালে। জয়গোবিন্দ গুহ তাঁর পুত্র তরুণ চিকিৎসক মধু-র অকাল প্রয়াণে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তারিণীবাবু তাঁকে এই অবস্থা থেকে বের করে আনার জন্য তাঁর পুত্রের নামানুসারে মধু চা বাগানটি প্রতিষ্ঠা করেন। এই বাগান প্রতিষ্ঠিত হলে জয়গোবিন্দবাবু আবার নতুন করে বাঁচার রসদ খুঁজে পান। তেমনই রাধারাণী চাবাগানের নামকরণ হয় মালিকের পরিবারের গৃহবধূর নামানুসারে। এরকম উদাহরণ আরো অনেক আছে।

বাগানের ম্যানেজার বাংলো, শ্রমিক মহল্লা, বাবু কোয়াটার্স, তাকে কেন্দ্র করে খেলার মাঠ, পুজো মন্ডপ, ক্লাব, সাপ্তাহিক হাট ইত্যাদি মিলিয়ে একটি নির্দিষ্ট জনপদ। পরাধীন ভারতে চা বাগানের চিকিৎসা পরিষেবা এবং তার সুশৃঙ্খল ব্যাপকতা বর্তমান সময়কালকেও পেছনে ফেলে দেবে। বাৎসরিক পুজোর সময় পুজো মন্ডপ হয়ে উঠত বাগানের যৌথ উৎসবের মিলনক্ষেত্র। এমন একটি যৌথ ধারণা নিয়েই জন্ম হতে থাকে একের পর এক চা বাগানের।

পরাধীন ভারতে ডুয়ার্সের চা বাগানগুলির আর্থ-সামাজিক চিত্র মোটামুটি একই ছিল। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর ব্রিটিশ মালিকরা যখন ধীরে ধীরে বাগান ছেড়ে চলে যেতে থাকেন এবং তাদের ছেড়ে যাওয়া বাগানের মালিকানা আস্তে আস্তে দেশীয় নতুন মালিকদের হাতে আসতে শুরু করে তখন থেকে খুব ধীরে অথচ সংগঠিতভাবে চা বাগানের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে থাকে। প্রথম প্রজন্মের দেশীয় মালিকরাও এক সময় বাগান থেকে সরে দাঁড়ায়। বাগানের মালিকানা চলে যায় এক শ্রেণীর নতুন মালিকের হাতে। সূচনালগ্নের যৌথ পারিবারিক ধারণ-বাঁধন কাটতে শুরু করে। বাগান হয়ে ওঠে মুনাফা লুটের ক্ষেত্র। বাগানের পরিচর্যা, নতুন প্ল্যান্টেশান, শ্রমিক কর্মচারিদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করা এবং তাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে থাকে মালিক-শ্রমিকের দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্ব কখনো কখনো হিংসাত্মক আকার ধারণ করে। ডুয়ার্সের মাদারিহাট চা বাগানের তারকেশ্বর লোহারের ঘটনা মনে পড়লে এখনো গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।

এরপর নব্বইয়ের দশকে চা বাগানে পঞ্চায়েতি রাজ চালু হয়। চা বাগানের পঞ্চায়েতি রাজ চা বাগানের দীর্ঘ সময়কালের সংযুক্ত চরিত্রকে এক ধাক্কায় ভেঙে ফেলে। মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে থেকে যায় শুধু শ্রম ও মজুরির সম্পর্ক। আবাসন, পানীয় জল, যোগাযোগ ব্যবস্থা, রেশন, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষার দায়িত্ব চলে যায় গ্রাম পঞ্চায়েতের হাতে। এর ফলে একদিকে যেমন বাগান-শ্রমিক কর্মচারীদের স্বাধীন রাষ্ট্রের সরকারের জনকল্যাণমুখী কর্মসূচির মধ্যে আনা গেল, তেমনি অন্যদিকে রাজনীতির রং দেখে শুরু হয়ে যায় আমরা-ওরার খেলা। পঞ্চায়েতকে কেন্দ্র করে বাসা বাঁধে দুর্নীতি। রাজনৈতিক রঙে বিভক্ত হয়ে শ্রমিক-কর্মচারীরা আখেরে নিজেদের প্রাপ্ত থেকে বঞ্চিত হতে থাকে। পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলের অতি সক্রিয়তার ফলে মালিক নিরুৎসাহ হয়, শুধু বেতনের দায়িত্ব বাদে অন্যান্য সমস্ত প্রচলিত সামাজিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পায়, শুধু মুনাফা অর্জনের দিকে নজর দেয়। বাগান পরিচর্যা, নতুন প্ল্যান্টেশন ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়।

কিছু প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি বাদে ডুয়ার্সের বেশিরভাগ চা বাগান এমন এক শ্রেণীর মালিকের হাতে চলে যায় যাদের চা-বাগানের প্রারম্ভিক চরিত্র, কাঠামো সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। বহু মালিক বাগান কিনে কিছুদিন বাগান চালিয়ে, বাগানকে দেখিয়ে মোটা টাকার ব্যাঙ্ক লোন নিয়ে বাগান বন্ধ করে চলে যায় বাগান শ্রমিক-কর্মচারিদের অসহায় অবস্থায় ফেলে দিয়ে। জলপাইগুড়ি শহরের অনতিদূরে রাইপুর চা বাগান ২৩ বছর ধরে বন্ধ। সর্বশেষ মালিক বাগানটি লিজে নিয়ে চার বছর চালিয়ে বাগান দেখিয়ে ব্যাঙ্ক থেকে ১৫ কোটি টাকা লোন নিয়ে ২০০২ সালে রাতের অন্ধকারে পালিয়েছে। সেই থেকে বাগান বন্ধ। ডুয়ার্সের বহু বাগান এমন সব মালিক কিনে নিচ্ছেন যারা বাগানের মুনাফা, বাগানকে দেখিয়ে লোন নিয়ে বাগানের বাইরে অন্য ব্যবসায় ব্যবহার করছেন। ফলে বহু বাগান রক্তশূন্যতায় ভুগছে, বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, শ্রমিক-কর্মচারীরা তাদের প্রাপ্য বেতন-বোনাস পাচ্ছেন না। শ্রমিকের জীবনে চরম হতাশা নেমে আসা ছাড়া আর কোনো পথ নেই।

মালিক-বাবু-কুলিদের যাবতীয় সুখ-দুঃখ মান-অভিমান বাদ-প্রতিবাদ শোষণ-শাসনের মধ্যেও নতুন পাতার আবির্ভাব এক একটি বাগানকে যে যৌথ বন্ধনে আবদ্ধ রাখত সেই দিনগুলি আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। বসন্তে বা বর্ষাশেষের নরম রোদের আদরমাখা সবুজ গালিচার যে মায়ার জালে বংশানুক্রমিক আটকা পড়ে গিয়েছিল ভিনরাজ্য থেকে আসা হতদরিদ্র মজুরের দল, ম্যালেরিয়া বা হিংস্র শ্বাপদের সঙ্গে বাস করে কঠিন দিনযাপন যাদের বিচলিত করে নি কোনোদিন, দেড়শ বছর পেরিয়ে সামাজিক বিবর্তনের ফলে ডুয়ার্সের চা সাম্রাজ্যের সেই রোমাঞ্চভরা দিনলিপি আজ ইতিহাসের অন্ধকার গুহায় আশ্রয় নিতে চলেছে!

করোনা কালের প্রতিবেদন ফ্রি রিডিং

Disclaimer: Few pictures in this web magazine may be used from internet. We convey our sincere gratitude towards them. Information and comments in this magazine are provided by the writer/s, the Publisher/Editor assumes no responsibility or liability for comments, remarks, errors or omissions in the content.
Copyright © 2026. All rights reserved by www.EkhonDooars.com

Design & Developed by: WikiIND

Maintained by: Ekhon Dooars Team