অরবিন্দ ভট্টাচার্য
ঐতিহ্যবাহী রাজনগর কোচবিহারকে ‘হেরিটেজ’ ঘোষণার তোড়জোড় শুরু হয়েছিল বেশ কয়েক বছর আগে। গঠিত হয়েছিল হেরিটেজ কমিটি। কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, কোনোরকম নিয়মনীতি বা মানদণ্ডের তোয়াক্কা না করে হেরিটেজ তালিকায় যে ১৫৪টি স্থাপত্যকে অন্তর্ভুক্ত করে দেওয়া হয়েছে, সেই তালিকায় কোনো অজ্ঞাত উদ্দেশ্যে মাত্র ৩০-৩৫ বছর আগে নির্মিত বেশ কিছু দালানকেও ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। আবার এমন কিছু জলাশয় বা বাড়িঘরকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বর্তমানে যার কোনো অস্তিত্বই নেই! বছর তিনেক আগে রাজ্য হেরিটেজ কমিশন, এমনকি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর দফতরে মেইল করে গোটা ঘটনা জানানোর পর তার প্রাপ্তিস্বীকার পর্যন্ত পাওয়া যায় নি, উত্তর তো দূর অস্ত! আর হেরিটেজ তালিকা অবাঞ্ছিতভাবে এত দীর্ঘ হওয়ায় সেগুলো সংরক্ষণ করতে যে বিশাল অংকের অর্থের প্রয়োজন হবে, অর্থ সংকটে ডুবে থাকা রাজ্য সরকারের পক্ষে বাস্তবে তার কতটুকু পরিমাণ দেওয়া সম্ভব সেটা নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজনগরের বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
দশক সাতেক পিছিয়ে যাই! বিদেশী বন্ধুদের সাথে আকাশনীল হুডখোলা রোলস রয়েসে চেপে রাজনগরে বেড়াতে বেড়িয়েছেন মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্রনারায়ণ। গাড়ি চলেছে ধীর গতিতে সুনীতি রোড ধরে। সে দৃশ্য দেখে বিস্মিত হয়ে উঠছে বাবার হাত ধরে আদুর গায়ে দাঁড়িয়ে ছোট্ট এক অচিন বালক। কখনো বা তাঁর সঙ্গী দু'বছরের বড় দিদি। মায়ের মুখে শোনা পক্ষীরাজে চেপে রাজকুমারের ভিনদেশে পাড়ি দেওয়ার গল্পের চিত্রকল্প ভেসে আসে বালকের সবুজ মনে। ভোরের আলো ফুটতেই বকুল তপসি আর নাগকেশরের মধুর গন্ধে মুখরিত পথে ব্যাকুল হয়ে দিদির হাত ধরে চুপি চুপি ছোট্টো বালকটি পৌঁছে যেত রাজার বাগানে। প্রহরীর দৃষ্টি এড়িয়ে রাজার বাগান থেকে ফুল চুরি! খৈনিটেপা পেল্লাই চেহারার হিন্দুস্থানী দারোয়ানের সাথে লুকোচুরি খেলে গোলাপজাম, ফলসা আর পানিয়াল চুরি করে ইজেরের পকেটে পুরে গুডবয় সেজে বাড়ি ফেরা, অথবা পড়াশোনা চুলোয় তুলে ছিপ হাতে এ দিঘি সে দিঘি থেকে ‘খালুই’ ভরে ট্যাংরা-পুঁটি নিয়ে বাবার চোখ এড়িয়ে চুপি চুপি মায়ের হাতে তুলে দেওয়া। এইসব টুকরো টুকরো স্মৃতিগুলো হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়া কাকভোরে আঁকড়ে ধরে আমায়। আজ জীবন সায়াহ্নে এসে স্বপ্নের সেই শহরটাকে খুঁজে বেড়াই খ্যাপার পরশ পাথরের মতো। মেলাতে পারি না কিছুই।
কেমন ছিল সেই রাজার শহর? এ প্রশ্ন আমায় মাঝেমধ্যেই করে থাকেন আমার অনুজ বন্ধুরা। সে যুগের বিখ্যাত ইংরেজ স্থপতি হটন সাহেবকে দিয়ে মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ যে শহরটাকে পাশ্চাত্য নির্মাণশৈলীতে সাজিয়ে তুলেছিলেন, সেই শহরটাকে কমল দাশগুপ্ত, শৈলেন রায়, আব্বাসউদ্দিন, অমিয়ভূষণ মজুমদার, সুবোধ চক্রবর্তী, শীর্ষেন্দু অথবা বিশ্বজিৎ অঞ্জনা ভৌমিকেরা তাঁদের শৈশবে যেমনটি দেখেছিলেন, তেমনটি হয়তো আমার দেখা হয় নি। তবু যেটুকু দেখেছি, রাজ্য তো দূরে থাক ভূ-ভারত অন্তত দুবার ঘুরেও একমাত্র মহীশূর ছাড়া অন্য কোনো প্রাচীন রাজ শহরের সাথে এ শহরের কোন মিল খুঁজে পাই নি। চওড়া পিচঢালা রাস্তা। সেই রাস্তার দু’ধারে অন্তত সাত ফুট কাঁচা রাস্তা, তারপর চওড়া নর্দমা, তারপর বাগান করার জন্য আরো ছয় ফুট নো-মেনস ল্যান্ড তারপর প্রজাদের বাড়ির সীমানা প্রাচীর। মূল নর্দমাগুলো ছিল ইট দিয়ে গাঁথা, কিন্তু পলেস্তারা আবৃত ছিল না। প্রতিটি নর্দমার নিচটা ছিল মাটির। নর্দমার লেভেল বজায় রাখতে কিছু দূর পর পর একটা করে কংক্রিটের U দেওয়া থাকত। বর্ষার ঠিক আগে আগে পূর্ত দফতরের ড্রেন কুলিরা রাস্তার পাশের কাঁচা রাস্তায় U আকৃতির ওয়াটার প্যাসেজ কেটে দিয়ে যেত। সেই প্যাসেজ দিয়ে রাস্তার জল নর্দমায় গড়িয়ে যেত। হাজার বৃষ্টি হলেও রাস্তায় এক ফোটা জলও জমত না আমার শৈশবের সেই শহরে।
শহরের রাজবাড়ীর সিংহদুয়ার থেকে সোজা পূর্ব দিকে আড়াই কিলোমিটার গিয়ে বাঁ দিকে ঘুরে গেলেই দুটো সুন্দর বাংলো। একটির নাম সুখনিবাস। আর অন্যটির নাম মেঘমন্দির, যে বাড়িটিতে রাজার বৈমানিকরা থাকতেন। বিশ্বাস করুন, এ কোচবিহার বিমানবন্দরে প্রথম বিমান নেমেছিল ১৯৩৪ সালে। মহারাজাদের পাশাপাশি কোচবিহারের রাজকুমারী ইলা দেবী (ত্রিপুরার রানী) বিমান চালাতে পারতেন। কেন্দ্র-রাজ্য ইগোর লড়াইতে যে কোচবিহার বিমানবন্দর অচ্ছুৎ হয়ে রয়েছে, কোচবিহারের প্রজাবৎসল মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণ কিন্তু তাঁর প্রজাদের জন্য সেই বিমানবন্দর থেকে উড়ান চালু করে দিয়েছিলেন বিগত শতাব্দীর চারের দশকেই। স্কাই-প্লেয়ার্স আর এয়ার ক্যারিং কর্পোরেশনের ডাকোটা বিমান প্রথম দিকে যাত্রীদের সাথে সাথে পাট তামাকও বয়ে নিয়ে যেত কলকাতায়। ভারতের প্রথম কমার্শিয়াল মহিলা বিমান চালক দূর্বা বন্দ্যোপাধ্যায়, ওড়িশার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়কের পিতা বিজু পট্টনায়ক কলকাতা থেকে নিয়মিত বিমান নিয়ে আসতেন কোচবিহারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্র শক্তির বিমানগুলো বার্মা ফ্রন্টে যাওয়া আসার পথে বহুবার এই বিমান বন্দরে নেমে জ্বালানি ভরেছে। সে সবই এখন ইতিহাস।
বিমান বন্দরের পাশেই ছিল সুপারিনটেনডেন্ট অফ স্টেট-এর সরকারি বাংলো (যেটা এখন কোচবিহারের জেলা শাসকের বাংলো।) প্রশাসানিক কারণে রাজ্যের মুখ্য প্রশাসককে সাধারণ প্রজাদের থেকে একটু বিচ্ছিন্ন স্থানে রাখার নীতি তখনও পুরোপুরি বজায় ছিল। হাতিশাল (পিলখানা ) ঘোড়াশালের (আস্তাবল ) পাশাপাশি রাজার নিজের পাওয়ার হাউস ছিল সেই যুগে। ইউরোপ থেকে আমদানি করা ‘বাঁকাই’ আর ‘স্কোডা’ কোম্পানির ডিজেলচালিত ইঞ্জিন দিয়ে শহরের মানুষকে বিদ্যুৎ আর পানীয় জল সরবরাহ করা হতো। ১৯৪৫ সাল থেকেই রাজার পরিবহন নিগমের ফোর্ড আর থ্যামস বাস ছুটতো গোটা উত্তরবঙ্গে। ট্রেন ছুটেছে গীতালদহ-মোগলহাট-তিস্তা-কাউনিয়া-পার্বতীপুর হয়ে শিয়ালদহ পর্য্যন্ত সেই উনবিংশ শতাব্দীর শেষ থেকেই।
রাজ আমলে দাবার বোর্ডের মতো করে সাজানো শহরের খোপে খোপে গড়ে তোলা হয়েছিল স্কুল কলেজ বাজার হাসপাতাল খেলার মাঠ মন্দির মসজিদ। পাশ দিয়ে প্রশস্ত রাস্তা আর গোটা শহর জুড়ে অন্তত পঁয়ত্রিশটি জলাশয়। সবচেয়ে বড় জলাশয় সাগরদিঘির আয়তন প্রায় চল্লিশ বিঘা। এ হলো গোটা শহরের ফুসফুস। এই জলাশয় বরাবরই ছিল সংরক্ষিত। দিঘিটা ছিল ভূমি সংস্কার দফতরের, জল আর মাছ ছিল মৎস দফতরের আর দেখভালের দায়িত্ব ছিল পুরসভার। এই দিঘির চার ধার ছিল সম্পূর্ণ মুক্ত। মাঝে মাঝে বসার সুদৃশ্য বেঞ্চ, যেমনটা দেখেছি মাদ্রিদ রোম প্যারিস বার্ন জুরিখে এমনকি আমাদের কাছের দেশ সিঙ্গাপুরেও।
বাম আমলে কোচবিহার পৌরসভা যে দিন থেকে অপরিকল্পিতভাবে কোনোরকম লেভেলের তোয়াক্কা না করে ইচ্ছেমতো নর্দমাগুলো পাকা করে দেওয়া শুরু করে দিল, বিপত্তি বাধল সে দিন থেকেই। ওই আমলেই সাগরদিঘির উন্নয়নের নামে গোটা দিঘিটাকে লোহার গ্রিল দিয়ে ঘিরে কংক্রিটের খাঁচায় পরিণত করে দেওয়া হলো। দিঘির চারদিকের সবুজ নর্দমাকে বন্ধ করে দিয়ে তার উপর ফুটপাত নির্মাণ করে দেওয়া হলো। এবার শহরের সব থেকে উঁচু এলাকা সাগরদিঘির পারে একটু বৃষ্টিতেই জল জমা শুরু হয়ে গেল। এবার নতুন করে শহরের সৌন্দর্যায়নের কর্মসূচিতে ফুটপাতের নিচে আবার পাকা ড্রেন নির্মিত হয়েছে। কিন্তু সাগর দিঘির পাড়ের রাস্তা থেকে বৃষ্টির জমা জল সেই নর্দমায় গড়িয়ে যাওয়ার জন্য লোহার জালি দিয়ে যে আউটলেট নির্মিত হয়েছিল সেগুলোর সবই রাস্তার আবর্জনায় ঢাকা পড়ে গেছে! তাই আবার জল জমছে সাগরদিঘির পারে। সৌন্দর্যবর্ধনের নামে অবিমৃশ্যকারিতায় সাগরদিঘির মুক্ত পরিবেশকে উধাও করে দেওয়া হলো। শহরের বাকি দিঘিগুলির অবস্থা আরো শোচনীয়।
শহরের সর্বত্র অবিন্যস্তভাবে গড়ে উঠছে বহুতল, যেগুলির এক তলায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য বিপণি। কিন্তু কোথাও কোনো পার্কিং প্লেস রাখা নেই। গাড়ি-সাইকেল-মোটরবাইকের ভিড়ে ফুটপাত অবরুদ্ধ। রাস্তার জল নর্দমায় যাওয়ার পথ অবরুদ্ধ। মহার্ঘ ম্যাস্টিকের রাস্তা ভেঙে যাচ্ছে। পুরসভার সৌজন্যে সরকারি জলাশয়ের পার, রিক্সা স্ট্যান্ড দখল করে স্টল করে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। সৌন্দর্যায়নের নামে লোহার গ্রিল তুলে ব্যস্ততম রাস্তাগুলিকে নানা জায়গায় সংকুচিত করে দেওয়া হয়েছে। এরপর অসংখ্য বেআইনি অটো-টোটো-ভুটভুটির যানজটে থমকে গেছে হেরিটেজ শহর কোচবিহার, পরিবেশ দূষণের কথা তো ছেড়েই দিন। রাজ আমলের প্রসিদ্ধ জলাশয় লালদিঘির পশ্চিমপাড় সরকারি আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে পুরসভার উদ্যোগে অন্তত ত্রিশ ফুট ভর্তি করে দেওয়া হয়েছে। অনেক জলাশয় শহরের মানচিত্র থেকে চিরতরে বিলীন হয়ে গেছে।
খড়্গপুর আইআইটি, মিউনিসিপ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিরেক্টরেট ও পূর্ত দফতরের স্থপতিদের নিয়ে একটি উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন টিমকে দিয়ে কোচবিহার শহরকে নতুন করে সাজিয়ে তুলে হেরিটেজ তকমা দিতে একটি বিস্তারিত পরিকল্পনা রাজ্য সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছিল বছর কয়েক আগে। প্রয়োজনে এই বিষয়ে শহরের বর্ষীয়ান নাগরিকদের পরামর্শ-মতামত এবং এ সম্পর্কে মহাফেজ খানা ও গ্রন্থাগারে রক্ষিত বিভিন্ন বইপত্র ও দলিল দস্তাবেজের সহযোগিতা নেওয়া হবে বলে বছর তিনেক আগে জানিয়েছিলেন জেলা প্রশাসনের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক। কিন্তু ইতিমধ্যেই তোর্সা দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেছে, সেই কাজ কোথায় থমকে আছে কেউ জানে না। দীর্ঘদিনের অভিভাবকহীন এই রাজনগরের করুণ অবস্থা দেখলে পূর্বতন রাজ্য সরকারের দেওয়া ‘হেরিটেজ’ তকমা আজ সত্যিই মুখ ভেংচে হাসে।
Have an account?
Login with your personal info to keep reading premium contents
You don't have an account?
Enter your personal details and start your reading journey with us
Design & Developed by: WikiIND
Maintained by: Ekhon Dooars Team