সব্যসাচী দত্ত
কলকাতা সদর দপ্তরের নির্দেশিকা মেনে দক্ষিণবঙ্গের গ্রীষ্মকালীন দাবদাহের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উত্তরেও বেশ কিছুদিন পালিত হলো ‘মর্নিং স্কুল’। প্রথমে শিক্ষক হিসেবে নিজের কথাই বলি, এখন মনে হচ্ছে বছরভর এই অভ্যেস থাকলে মন্দ হয় না। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে সোজা স্কুল পৌঁছে যাওয়ার মধ্যে বেশ একটা এনার্জি লেবেল বা জীবনী শক্তি বৃদ্ধি অনুভব করা যায়। স্কুল শেষ করে বাড়ি ফিরে এসে দিনভর হাতে যে অখণ্ড সময় মেলে তা পরিবারের সঙ্গে কিংবা খেলাধূলা-সামাজিক-সাংস্কৃতিক কাজের জন্য আদর্শ। আবার পরদিন স্কুল থাকার ফলে তাড়াতাড়ি খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়ার যে স্বাস্থ্যকর দিক রয়েছে সে তো বলাই বাহুল্য।
বেশ কয়েক বছর যাবৎ পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়েই চলেছে। ইতিমধ্যেই তার প্রভাব আমরা লক্ষ্য করছি বিভিন্ন ক্ষেত্রে। মার্চ মাসের শুরু থেকেই কলকাতা সহ দক্ষিণ বঙ্গের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের মালদহ ও দুই দিনাজপুরের কিয়দাংশে তাপের প্রভাব অনুভব করা যায়। এপ্রিল থেকে জুনের শেষ পর্যন্ত প্রবল তাপপ্রবাহে জনজীবন বিদ্ধস্ত হ’তে শুরু করে। মে-জুন মাসে দার্জিলিং-কালিম্পং-এর পার্বত্য অঞ্চল বাদ দিয়ে উত্তরবঙ্গের বাকি জেলাগুলিতে প্রাকৃতিক উষ্ণতা বেড়ে গিয়ে অসহ্য হয়ে ওঠে।
এখানে বলে রাখা ভালো গত কয়েক বছরে উত্তরবঙ্গের প্রাকৃতিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে অকল্পনীয় হারে। কমেছে বৃষ্টির পরিমাণ। আবার প্রবল গরমের মাঝে হঠাৎ প্রচুর বৃষ্টি হয়ে আবাহাওয়া স্বাভাবিকের তুলনায় শীতল হয়ে যায়। দু’দিন পরেই অসহ্য গরম ফিরে আসে। প্রকৃতির এই খামখেয়ালের জন্য মানুষের তথাকথিত অবিমৃষ্যকারী উন্নয়ন প্রকল্পসমূহ দায়ী। অন্য অনেক কিছুর মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়েরও কু-প্রভাব সরাসরি শিক্ষাক্ষত্রে এসে পড়ে। যার বলি হয় কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। কারণ দাবদাহ বেড়ে গেলেই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিগত সরকারের সময়ে বিদ্যালয়গুলি অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটি দিয়ে দিতেন। তা নিয়ে অনেক আলোচনা সমালোচনা হয়েছে, কিন্তু তাঁর সিদ্ধান্তের ব্যত্যয় হয়নি।
সরকার বদলেছে। সিদ্ধান্ত বদলেছে। নবগঠিত সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্কুলগুলি বন্ধ না রেখে প্রায় মাসখানেক দুপুরের পরিবর্তে সকালে করবার নির্দেশ দেওয়া হল। শিক্ষার্থীদের জন্য নেওয়া এই সিদ্ধান্ত খুবই ফলপ্রসু সাব্যস্ত হয়েছে। কারণ স্কুল বন্ধ থাকলে শিক্ষাদিবস নষ্ট। সিলেবাস শেষ করাটা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষাক্ষেত্রে বিগত সরকারের বিভিন্ন হঠকারি সিদ্ধান্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বারংবার বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে। আর শিক্ষার্থীরা ক্রমেই পিছিয়ে পড়েছে।
শিক্ষার্থীদের জন্য সকালে ক্লাশ হওয়ার অনেকগুলি সুবিধে লক্ষ্য করা গেছে। ঘুম থেকে সকাল সকাল উঠবার উপকারিতা তো রয়েইছে। সকালে তুলনামূলক শীতল আবহাওয়ায় তাজা মন নিয়ে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে এসে উপস্থিত হয়েছে। উপস্থিতির হার বেড়েছে অনেক। লেখাপড়ায় মনযোগ করতে পেরেছে অনেক বেশি। আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য করেছি মিড-ডে-মিল-কে কেন্দ্র করে। গ্রামীণ বিদ্যালয়গুলিতে দুপুরে ক্লাশ থাকলে অনেক শিক্ষার্থীই বাড়ি থেকে কিছু খেয়ে আসতে পারে না। কারণ সকালে মা-বাবা কাজে বেরিয়ে যান, রান্না করতে পারেন না। অনেকেই দুটো বিস্কুট, একবাটি মুড়ি বা আগের রাতের বাসি রুটি খেয়ে চলে আসে, যা স্বাস্থ্যকর নয়। দুপুরের স্কুলে মিড-ডে-মিল খেতে খেতে দেড়টা-দুটো বাজে। তাই দীর্ঘসময় বাচ্চাটি প্রায় না খেয়েই থাকে। অথচ আমরা জানি সঠিক পুষ্টির জন্য সঠিক সময়ে খাদ্যগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে সকালের ‘ব্রেকফাস্ট’ ভারি হওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারি। সকালে স্কুল হলে মিড-ডে-মিল খাওয়ার সময় থাকে সকাল সাড়ে ন’টা থেকে দশটা। ফলে আগের রাতের খাবারের পর দীর্ঘ ব্যবধানে সঠিক শরীর পাচ্ছে গরম পুষ্টিকর খাবার।
একজন শিক্ষক হয়ে এই প্রথম বেশ কিছুদিন সকালের একটা দীর্ঘ সময় ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাটাবার সুযোগ পেলাম। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অত্যন্ত সুখকর। সকালে শিক্ষার্থীরা কেবল গরম থেকেই কিছুটা রেহাই পাচ্ছে না। স্কুলের পাঠ তাদের তাজা মন দুপু্রের তুলনায় সকালে গ্রহণ করছে বেশি। লেখাপড়ায় মনযোগ তুলনামূলক বেড়েছে অনেক। শিশু-মনোবিদের সঙ্গে কথা বলেও বুঝতে পারলাম তাঁরা প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিকে (প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত) পাকাপাকিভাবে সকালে করার পক্ষে রায় দিচ্ছেন। কারণ সকালের ক্লাশ ফলপ্রসু বেশি। সঙ্গে তাঁরা এও বলছেন, স্কুল পরিচালনার বার্ষিক কার্যক্রম নির্ধারণ কেন্দ্রীয় ভাবে কলকাতা থেকে না করে সে দায়িত্ব স্থানীয় প্রশাসককে ন্যস্ত করলে এবং স্থানীয় শিক্ষাধিকারিকরা এ নিয়ে সক্রিয় হলে লাভ বেশি শিশু শিক্ষার্থীদেরই।
Have an account?
Login with your personal info to keep reading premium contents
You don't have an account?
Enter your personal details and start your reading journey with us
Design & Developed by: WikiIND
Maintained by: Ekhon Dooars Team