সুপ্রিয় চন্দ
স্বাধীনতার সাত দশক পেরিয়েও উত্তরবঙ্গের উন্নয়ন আজও এক অসমাপ্ত অধ্যায়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের ক্ষত বুকে নিয়ে যে জনপদ পথ চলা শুরু করেছিল, তার মানচিত্রে আজও অনুন্নয়নের রেখাগুলো স্পষ্ট। চা-বাগান, বনাঞ্চল আর পাহাড়-ডুয়ার্সের প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এই অঞ্চল বারবার শুধুই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ক্যানভাস হয়ে থেকেছে, বাস্তবের উন্নয়ন হয়ে ওঠেনি।
উত্তরবঙ্গের আবেগ তার ভূগোলের মতোই জটিল। কামতাপুরী, রাজবংশী, আদিবাসী, গোর্খা, বাঙালি—প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ইতিহাস, ভাষা ও আত্মপরিচয়ের দাবি এখানকার মাটিতে মিশে আছে। এই আবেগকে কখনও ভোটের অঙ্কে ব্যবহার করা হয়েছে, কখনও বিচ্ছিন্নতাবাদের তকমা দিয়ে দমন করার চেষ্টা হয়েছে। অথচ এই আবেগই ছিল ভারতীয় জাতীয়তাবোধের পরিপূরক। নেতাজির আইএনএ থেকে মুক্তিযুদ্ধের শরণার্থী— উত্তরবঙ্গ বারবার প্রমাণ করেছে, তার আবেগ বিচ্ছিন্নতার নয়, বরং বৃহত্তর ভারতীয় অস্তিত্বের অংশীদার হওয়ার।
স্বাধীনতার পর কংগ্রেস, বামফ্রন্ট, তৃণমূল— প্রতিটি শাসকদলই উত্তরবঙ্গকে ‘গেটওয়ে অফ নর্থ-ইস্ট’ বলে আখ্যা দিয়েছে। কিন্তু গেটওয়ে খুলে দেওয়ার পর ভেতরের ঘরগুলো সাজানোর কাজটা অধরাই থেকে গেছে। এইমসের স্বপ্ন দেখিয়ে বছরের পর বছর কাটিয়ে দেওয়া, বাগডোগরা বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিকীকরণ নিয়ে টালবাহানা, চা-বাগানের শ্রমিকদের মজুরি বঞ্চনা— এই চিত্রগুলো প্রমাণ করে যে কলকাতাকেন্দ্রিক উন্নয়নের মডেলে উত্তরবঙ্গ বরাবরই প্রান্তিক।
আমি নিজে তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য সম্পাদক ও মুখপাত্র হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছি। দলের ভেতর থেকে দেখেছি, কীভাবে উত্তরবঙ্গের প্রকৃত সমস্যাগুলোকে স্লোগান আর প্রকল্পের মোড়কে ঢেকে দেওয়া হয়। উন্নয়ন মানে শুধু রাস্তা বা আলো নয়, উন্নয়ন মানে আত্মমর্যাদা। যে মাটির মানুষ দেশের সীমান্ত পাহারা দেয়, যে মাটির চা বিশ্বের দরবারে ভারতের পরিচয় বহন করে, সেই মাটির মানুষের আবেগকে সম্মান না দিলে কোনো উন্নয়নই সম্পূর্ণ হয় না।
দেশভাগের পর উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক কাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল। রেলপথ ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় শিলিগুড়ি-হলদিবাড়ি-চ্যাংড়াবান্ধা অঞ্চলের বাণিজ্যিক গুরুত্ব কমে যায়। একদা যে জলপাইগুড়ি ছিল ‘ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার লিভারপুল’, পাট ও তামাকের ব্যবসায় যার খ্যাতি ছিল বিশ্বজোড়া, স্বাধীনতার পর সেই শহর প্রশাসনিক গুরুত্ব হারিয়ে ক্রমশ মফস্বলে পরিণত হল। কোচবিহার রাজ্য ভারতভুক্তির পর যে প্রতিশ্রুতি নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, ‘গ’ শ্রেণির রাজ্য থেকে জেলায় অবনমন সেই প্রতিশ্রুতির প্রথম বিশ্বাসভঙ্গ। দার্জিলিং পার্বত্য অঞ্চলের চা-শিল্পে ব্রিটিশ আমলের মালিকানা বদলালেও শ্রমিকের ভাগ্য বদলায়নি। বাগান বন্ধ, মালিক পলাতক, আর শ্রমিকের থালায় ভাতের বদলে শুধুই অপুষ্টি— এই চিত্র স্বাধীনতার ৭৮ বছর পরেও বদলায়নি।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মানচিত্রে তাকালে বঞ্চনার ছবিটা আরও স্পষ্ট হয়। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৯৬২ সালে, অথচ আজও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা কলেজগুলোতে স্থায়ী অধ্যাপকের সংকট, গবেষণার বরাদ্দ নগণ্য। উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতের রোগীদের ভরসা, কিন্তু পরিকাঠামোর অভাবে এখানকার ডাক্তারদেরই রেফার করতে হয় কলকাতা বা ভেলোরে। কোভিড অতিমারির সময় আমরা দেখেছি, শিলিগুড়ি থেকে কোচবিহার পর্যন্ত একটি মাত্র আরটি-পিসিআর ল্যাবের উপর কতটা নির্ভরশীল ছিল আট জেলার মানুষ। এইমস-এর শিলান্যাস হয়, জমি অধিগ্রহণ হয়, কিন্তু হাসপাতাল আর হয় না। স্বাস্থ্য যদি নাগরিকের মৌলিক অধিকার হয়, তবে উত্তরবঙ্গের মানুষ কি দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক?
ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নে উত্তরবঙ্গের আবেগ সবচেয়ে স্পর্শকাতর। রাজবংশী, কামতাপুরী, কুরমালি, সাদরি—এই ভাষাগুলোকে অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি দীর্ঘদিনের। রাজ্য সরকার ‘ভাষা দিবস’ পালন করে, অ্যাকাডেমি গড়ে, কিন্তু সাংবিধানিক স্বীকৃতির জন্য কেন্দ্রের দরজায় কড়া নাড়ে না। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম নিজের মাতৃভাষাকে শুধু ‘উপভাষা’-র অপমান নিয়ে বড় হয়। দার্জিলিং পাহাড়ে নেপালি ভাষার আন্দোলন রক্ত ঝরিয়েছে, জিটিএ হয়েছে, কিন্তু স্বায়ত্তশাসনের প্রকৃত ক্ষমতা আজও আমলাতন্ত্রের ফাইলে বন্দি। আবেগকে যখন সাংবিধানিক কাঠামোয় জায়গা দেওয়া হয় না, তখন তা ক্ষোভ হয়ে জমতে থাকে। আর সেই ক্ষোভের ফসল তোলে বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি।
কৃষি ও কর্মসংস্থানের হাল দেখলে বোঝা যায়, কেন উত্তরবঙ্গের যুবসমাজ আজও পরিযায়ী। জলপাইগুড়ি-কোচবিহারের তামাক চাষ, মালদহ-দিনাজপুরের আম-ধান, আলিপুরদুয়ারের কমলালেবু— সবই প্রকৃতির দান। কিন্তু ফুড প্রসেসিং ইউনিট নেই, কোল্ড স্টোরেজ নেই, রফতানির পরিকাঠামো নেই। ফলে চাষি ফসলের দাম পায় না, আর শহরের বাজারে উত্তরবঙ্গের আমের বদলে জায়গা করে নেয় অন্য রাজ্যের পণ্য। চা-পর্যটন, ইকো-ট্যুরিজম, বর্ডার ট্যুরিজম—তিনটি শব্দই ফাইলবন্দি। সেবক-রংপো রেল প্রকল্প দশকের পর দশক ঝুলে থাকে, এশিয়ান হাইওয়ে-২ এর কাজ কচ্ছপের গতিতে চলে। কর্মসংস্থান না থাকলে আবেগ একদিন হতাশায় পর্যবসিত হয়, আর হতাশা থেকে জন্ম নেয় পরিচিতি-সংকট।
রাজনৈতিক দলগুলো এই সংকটকে ভোটের মরশুমে জাগিয়ে তোলে, আর ভোট মিটলেই ঘুম পাড়িয়ে দেয়। বামফ্রন্টের ৩৪ বছরে ‘উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন পর্ষদ’ গঠিত হয়েছিল, কিন্তু পর্ষদের চেয়ারম্যান বদলেছে, উন্নয়ন বদলায়নি। তৃণমূলের জমানায় ‘উত্তরকন্যা’ হয়েছে, মন্ত্রী হয়েছে, সচিবালয়ের শাখা হয়েছে। কিন্তু সচিবালয় থাকলেই যদি উন্নয়ন হত, তবে রায়গঞ্জ, বালুরঘাট, ইসলামপুরে আজও কেন ছাত্রদের উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতা ছুটতে হয়? কেন আজও তিস্তা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে দরকষাকষিতে উত্তরবঙ্গের কৃষকের মতামত নেওয়া হয় না? কারণ উন্নয়নের সংজ্ঞা কলকাতায় বসে ঠিক হয়, শিলিগুড়ির ডালখোলা মোড়ে দাঁড়িয়ে নয়।
আমি তৃণমূল কংগ্রেস ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি কারণ দলীয় আনুগত্যের চেয়ে মাটির প্রতি দায়বদ্ধতা আমার কাছে বড়। মুখপাত্র হিসেবে আমি দলের নীতি তুলে ধরেছি, কিন্তু রাজ্য সম্পাদক হিসেবে যখন দেখেছি উত্তরবঙ্গের ফাইলগুলো নবান্নের চোদ্দতলায় গিয়ে হারিয়ে যায়, তখন বিবেক দংশন করেছে। রাজনীতি যদি মানুষের শেষ ভরসা না হয়, তবে সেই রাজনীতি করে লাভ কী? যখন দল নিজেই জনগণের আবেগের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তখন দল ছাড়া বা দল বদল বিশ্বাসঘাতকতা নয়।
আগামী দিনের রাজনীতি ঠিক করবে উত্তরবঙ্গের ভবিষ্যৎ। যে রাজনৈতিক দর্শন ‘এক ভারত, শ্রেষ্ঠ ভারত’ মন্ত্রে বিশ্বাস করে, যে দর্শন সীমান্তকে দুর্বলতা নয়, শক্তি মনে করে, যে দর্শন পরিচিতির দাবিকে বিচ্ছিন্নতা নয়, বৈচিত্র্যের উদযাপন বলে মনে করে— উত্তরবঙ্গের মানুষ সেই দর্শনের পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত। উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আর্থিক প্যাকেজ নয়। প্রয়োজন সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে কামতাপুর, গোর্খাল্যান্ড বা গ্রেটার কোচবিহার নিয়ে খোলা মনে আলোচনা। প্রয়োজন চা-বাগান শ্রমিকদের জন্য কেন্দ্রীয় মজুরি বোর্ড, তিস্তা প্রকল্পের জন্য আন্তর্জাতিক জলবণ্টন নীতিতে উত্তরবঙ্গের অংশীদারিত্ব এবং এনজেপি-কে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার মাস্টারপ্ল্যান।
উত্তরবঙ্গের আবেগ আর বঞ্চনা সমার্থক নয়। এই আবেগ ভারতীয়ত্বেরই অংশ। স্বাধীনতার অমৃতকালে দাঁড়িয়ে আমাদের শপথ হোক— আর কোনো প্রজন্মকে যেন বলতে না হয়, ‘আমরা কলকাতার উপনিবেশ’। দল আসবে, দল যাবে। কিন্তু তিস্তা বইবে, কাঞ্চনজঙ্ঘা থাকবে, আর থাকবে উত্তরবঙ্গের মানুষের অদম্য স্পর্ধা। সেই স্পর্ধাকেই সম্মান জানানোই হবে প্রকৃত উন্নয়ন। রাজনৈতিক পরিচয় বদলাতে পারে, কিন্তু মাটির প্রতি দায়বদ্ধতা বদলায় না। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই নতুন পথের সন্ধান শুরু হল। সকল শুরু শুভ হোক।
Have an account?
Login with your personal info to keep reading premium contents
You don't have an account?
Enter your personal details and start your reading journey with us
Design & Developed by: WikiIND
Maintained by: Ekhon Dooars Team