রূপন সরকার
পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি সরকারের মন্ত্রিসভায় উত্তরবঙ্গের প্রতিনিধিত্ব রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। তবু মন ভালো নেই জলপাইগুড়ি জেলাবাসীদের। জেলার সাতটি বিধানসভাতেই বিজেপি প্রার্থীদের বিপুল জয় সুনিশ্চিত করেও কোনো মন্ত্রী নেই জেলা থেকে। সোশ্যাল মিডিয়ায় গত দুদিন ধরে ঝরে পড়ছে সেই অভিমানই। আলিপুরদুয়ার আলাদা জেলা হওয়ার পর থেকে এমনিতেই অঙ্গচ্ছেদের ব্যথা এখনো পুরোপুরি যায় নি উত্তরের এই ঐতিহ্যবাহী জেলার পুরনো বাসিন্দাদের! নতুন সার্কিট বেঞ্চের গরিমা সে দুঃখ খানিক নিরসন করলেও, এক আধটা মন্ত্রী কি পাওয়া যেত না? এই অভিমানী প্রশ্নই ঘুরে বেড়াচ্ছে জেলার সদরে, আনাচে কানাচে।
এই উপলক্ষে নিন্দুক বা বিরোধীদের মুখে স্বভাবতই বাড়ে বঞ্চনার অভিযোগ। তাঁদের বক্তব্য, বিগত দুই সরকারের আমলেই জলপাইগুড়ি থেকে মন্ত্রী হননি এরকম রেকর্ড নেই। বাম আমলে অবিভক্ত জলপাইগুড়ি জেলার আলিপুরদুয়ার অংশ বাদ দিয়ে ধরলেও মন্ত্রী ছিলেন পরিমল মিত্র ও বনমালী রায়। তৃণমূল জমানায় মন্ত্রী ছিলেন গৌতম দেব ও বুলু চিক বরাইক। ২০২১ সালে উত্তরের জেলাগুলিতে ব্যাপক পরাজয়ে যদিও অভিমান হয়েছিল খোদ তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর! জলপাইগুড়ি থেকে তিনটি আসনে জয় পেলেও জেলার কপালে মন্ত্রিত্ব জোটে নি সেবার!
সম্প্রদায়গত সমীকরণেই কি পিছিয়ে গেল জলপাইগুড়ি জেলা? নাকি অভিজ্ঞতার অভাবে? রাজ্য মন্ত্রীসভার তালিকা দেখে এই প্রশ্নটাই ঘুরপাক খাচ্ছে জেলার রাজনৈতিক চর্চায়। অনেকেরই অনুমান, সম্প্রদায় তথা গোষ্ঠীগত সমীকরণকে মাথায় রেখেই মন্ত্রীসভা গঠিত হয়েছে। উত্তর থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের শ্রেণীগত পরিচয় দেখে অন্তত সেই কথাই প্রাথমিকভাবে মনে হয়। উত্তরবঙ্গ এমন একটা ভৌগোলিক পরিসর যার শ্রেণীগত বৈচিত্র্য বাকি বাংলা থেকে অনেকটাই আলাদা। সেই বাস্তবতা মাথায় রেখেই রাজবংশী, আদিবাসী, নেপালী, মতুয়া সব সম্প্রদায় থেকেই প্রতিনিধিরা মন্ত্রীসভায় স্থান পেয়েছেন।
তবে এর পাশাপাশি অবশ্যই রাজনৈতিক লড়াই ও সংগ্রামের সাফল্যকেও মর্যাদা দেওয়া হয়েছে বলেই অনেকের মনে হয়। যেমন তরুণতম বিরাজ বিশ্বাস, যিনি করনদিঘী কেন্দ্র থেকে শক্তিশালী বামপ্রার্থী মহম্মদ হাজি শাহবুদ্দিনকে হারিয়ে জিতে এসে প্রথমবার বিধায়ক হয়ে মাত্র ৩২ বছরে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। রাজ্যের সীমান্তবর্তী বিধানসভা কুমারগ্রামের বিধায়ক মনোজ ওঁরাও-এর মন্ত্রীপ্রাপ্তি আমাকে অবাক করে নি। মনোজ গত তিনবারের পরীক্ষিত বিধায়ক, গতবছর বিধ্বংসী বন্যার পরে তৃণমূলের আক্রমণ ও বাধা তুচ্ছ করে যেভাবে মানুষকে ত্রাণ পৌঁছে দিয়েছিলেন তাতে এই পুরস্কার মনোজের প্রাপ্র্য। বিশাল লামাও দুবারের বিধায়ক। স্বচ্ছ ভাবমূর্তির কালচিনির এই বিধায়কের তরাই-ডুয়ার্সের অন্যতম জনগোষ্ঠী নেপালী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে মন্ত্রীসভায় স্থান পাওয়া স্বাভাবিক। রায়গঞ্জের বিধায়ক কৌশিক চৌধুরীর মন্ত্রিত্ব পাওয়াও অযৌক্তিক। বৃহত্তম ব্যবধানে জয়ী আনন্দময় বর্মনের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। আর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শিলিগুড়ির বিধায়ক শংকর ঘোষ পূর্ণমন্ত্রিত্ব পেয়েছেন, মানুষও তাই চেয়েছিল, সে আশা পূর্ণ হয়েছে! কিন্তু পাশাপাশি জলপাইগুড়ি জেলা থেকে জিতে আসা বিজেপি-র সাত বিধায়কের মধ্যে এক শিখা চট্টোপাধ্যায় ছাড়া বাকিরা সব প্রথমবারের বিধায়ক। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও পরিচিতির দিক থেকেও তারা খুব একটা অভিজ্ঞ বা পরিচিত মুখ নয়। ফলত সঙ্গত কারণেই মন্ত্রিত্বের দৌড়ে তারা পিছিয়ে আছেন।
তবে সম্প্রদায়গত বিন্যাস কিংবা অভিজ্ঞতা-লড়াইয়ের মাপকাঠি, যে ভিন্নধর্মী ব্যাখ্যাই থাকুক না কেন, একটি বিষয়ে সব জলপাইগুড়িবাসী এককাট্টা। তাঁদের অভিমান ও হতাশাকে আনন্দে রূপান্তরিত করা যায় যদি শেষ পর্যন্ত উত্তরবঙ্গের প্রস্তাবিত এইমসকে জলপাইগুড়ি জেলার দোমোহানীর পরিত্যক্ত রেলের জমিতে স্থাপন করা হয়! সেই চর্চাই চলছে জেলার সর্বত্র। গোটা জলপাইগুড়ি এখন সেই ইতিবাচক দিনের দিকেই তাকিয়ে!
Have an account?
Login with your personal info to keep reading premium contents
You don't have an account?
Enter your personal details and start your reading journey with us
Design & Developed by: WikiIND
Maintained by: Ekhon Dooars Team